দুর্গাপুরের এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের এক ডাক্তারি পড়ুয়াকে গণধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে সমগ্র রাজ্যে। ঘটনায় তৎপর হয়েছে রাজ্যের স্বাস্থ্যভবন। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ওই বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কীভাবে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল, ঘটনার দিন কলেজ ক্যাম্পাস বা হোস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন ছিল, এবং কলেজ প্রশাসন প্রাথমিকভাবে কী ব্যবস্থা নিয়েছিল— এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য দ্রুত রাজ্যের স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
সূত্র অনুযায়ী, নির্যাতিতা তরুণী ওই কলেজেরই দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। অভিযোগ, এক সহপাঠীর সঙ্গে বাইরে খাবার খেতে গিয়েই তিনি গণধর্ষণের শিকার হন। ঘটনার পর তিনি অসুস্থ অবস্থায় ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন ও বিষয়টি সহপাঠীদের জানান। এরপর কলেজ প্রশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার সময় অভিযুক্ত সহপাঠী ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে পুলিশ। তিনি কোনওভাবে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিনা, কিংবা আগে থেকেই ঘটনার পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু জানতেন কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আসানসোল–দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (পূর্ব) অভিষেক গুপ্ত বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সমস্ত দিক মাথায় রেখে ধীরে-সুস্থে তদন্ত চলছে। আপাতত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। পর্যাপ্ত তথ্য হাতে এলেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাস্থল থেকে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফরেনসিক টিমও তদন্তে যুক্ত হয়েছে। তরুণীকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এদিকে, রাজ্যের স্বাস্থ্যভবন পুরো ঘটনার রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রয়োজনে কলেজের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারে।
এই ঘটনা চিকিৎসা শিক্ষার নিরাপত্তা ও নারী শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ দাবি করেছেন, কলেজ ক্যাম্পাসে ও আশপাশে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। এমন এক গুরুতর ঘটনার পর প্রশাসনের দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপের দাবি উঠেছে সর্বত্র।
প্রসঙ্গত, নির্যাতিত তরুণী ওড়িশার জলেশ্বর এলাকার বাসিন্দা এবং দুর্গাপুরের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়াশোনার সুবিধার্থে তিনি কলেজের হস্টেলেই থাকতেন। শুক্রবার রাতে তিনি তাঁর এক সহপাঠী বন্ধুর সঙ্গে রাতের খাবার খেতে হস্টেল থেকে বাইরে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরোলেও, পথে তাঁকে একটি নির্জন জঙ্গল এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে তিনি ভয়াবহ গণধর্ষণের শিকার হন। তরুণীর পরিবারের দাবি, ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তি যুক্ত ছিল এবং সেই বন্ধুর ভূমিকাও সন্দেহজনক। নির্যাতিতার বাবা সংবাদমাধ্যমকে জানান, “রাত ১০টা নাগাদ ওর বন্ধু আমাকে ফোন করে জানায়, মেয়েটির অবস্থা খারাপ। আমি তখনই ছুটে আসি। সাড়ে ৯টা নাগাদ একটি ছেলে খাবার খেতে আমার মেয়েকে গেটের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ২-৩ জন অপরিচিত যুবক সেখানে এসে পড়ে। সেই ছেলেটি তখন ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর আমার মেয়েকে এক ব্যক্তি জোরপূর্বক ধর্ষণ করে, তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং ৩ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় তাকে মারধর করা হয়। পরে সেই ছেলেটি আবার ফিরে আসে, তখন ৪-৫ জন অপরিচিত যুবককে সেখানে দেখতে পায়। তাদের হাতে ৩০০ টাকা ছিল, যা তারা দেয়। আমার মেয়ে তখন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। এরপর সেই ছেলেটি মেয়েকে নিয়ে কলেজে ফিরে আসে।”
নির্যাতিতার বাবার অভিযোগ, বেসরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁরা পুলিশকে খবর দিতে দেরি করেছেন এবং ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে “ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তিগত বিরোধ” বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তরুণীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় সত্যটি প্রকাশ্যে আসে। ঘটনার পর থেকে কলেজ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য পড়ুয়ারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাঁদের দাবি, কলেজ প্রশাসন ও হস্টেল কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো পদক্ষেপ নিত, তবে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটত না। তাঁরা অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং তরুণীকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও মানসিকভাবে তিনি চরম ভেঙে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি রাজ্যের স্বাস্থ্য শিক্ষা দপ্তরও যুক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্যভবনের নির্দেশে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে, যাতে জানা যাবে কীভাবে কলেজ ও হস্টেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যর্থ হল। গোটা ঘটনা এখন রাজ্যজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু, এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে।









